মিরপুরে সাকিব-তামিম

কাল বিকেলে যা–ও কাঙ্ক্ষিত ফ্রেমটা পাওয়া গেল, তা–ও সামনে কত বাধা! কখনো দুজনের মাঝে বসে পড়ছেন কোচ রাসেল ডমিঙ্গো, কখনো পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন সাইফউদ্দিন বা আফিফ হোসেন, আবার কখনোবা ক্যামেরার সামনে দেয়াল হচ্ছেন মাঠকর্মীদের কেউ। এটা ঠিক যে সাকিব-তামিমের মাঝে কোচ বা আশপাশে অন্য খেলোয়াড়দের রেখে তোলা ছবিগুলোরও খুব ভালো ক্যাপশন হয়। কিন্তু ফ্রেমে শুধু সাকিব-তামিম থাকা মানেই যে ভিন্ন কিছু! সেই ছবি তো শুধু ছবি নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের উত্থানের গল্পই বলা হয়ে যায় তাতে।

লড়াই করে হারে সুখ খোঁজার দিন থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নতুন দিনের পথ দেখিয়েছে যে প্রজন্ম, সাকিব-তামিম সেই প্রজন্মের অন্যতম প্রতিনিধি। ‘অন্যতম’ কারণ, এই প্রজন্মের নিউক্লিয়াসই এই দুজন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তামিমের চেয়ে সাকিব ছয় মাসের ‘বড়’। সাকিবের অভিষেক ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট, তামিমের ২০০৭-এর ৯ ফেব্রুয়ারি। এরপর অতিদ্রুতই তাঁরা হয়ে ওঠেন এ দেশের ক্রিকেটের বড় বিজ্ঞাপন এবং সেটি পারফরম্যান্স দিয়েই। একটা সময় এ রকমও চলে আসে, মাঠে বাংলাদেশ দলের ভালো কিছুর পূর্বশর্তই সাকিব বা তামিমের ভালো কিছু করা। অথবা ব্যাপারটা এমন ছিল, সাকিব-তামিম ভালো খেললেই বাংলাদেশ ভালো খেলে।

দলকে সেই নির্ভরতা দিতে পেরেছিলেন বলেই ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাঁদের কাঁধে ওঠে বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব। সাকিব অধিনায়ক, তামিম সহ-অধিনায়ক। কিন্তু বিসিবির চোখে এ দুজনের ‘ব্যাড বয়’ হতে সময় লাগল এক বছরের কম। বয়স কম ছিল, রাজনীতি-কূটনীতি অত বুঝতেন না। দুজনই অনেক অপ্রিয় কথা বলে ফেলতেন বোর্ড কর্তাদের মুখের ওপর। এসবের সঙ্গে যোগ হলো ২০১১ সালের জুলাই-আগস্টে জিম্বাবুয়ে সফরের ব্যর্থতা। সে বছরের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে বড় দুটি ঘটনা ঘটল। এক. লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা দল ঢাকায় এল। দুই. বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব হারালেন সাকিব ও তামিম।

তত দিনে এ দেশের ক্রিকেটে একটা কথা বেশ জনপ্রিয় হয়ে গেছে। কথাটা হলো, সাকিব-তামিম খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুজনের অভিষেক কাছাকাছি সময়ে। তাঁদের যুগলবন্দী নৈপুণ্য বাংলাদেশকে সাফল্য দেখায়। দুজন একসঙ্গে নেতৃত্বে আসেন এবং একই সঙ্গে নেতৃত্ব হারান। সব মিলিয়ে যেন মুদ্রার এপিঠ–ওপিঠ। সাকিব বললেই তামিমের নাম আসে, তামিম বললেই সাকিবের নাম আসে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে নায়ক আর পার্শ্বনায়কের চরিত্রে তাঁরাই থাকতে লাগলেন, নামটাই শুধু হয় অদল-বদল। সতীর্থ যেহেতু, মাঠ…ড্রেসিংরুম…টিম বাস…হোটেল—সবখানেই একসঙ্গে থাকা, বন্ধুত্ব তো হয়ে যায়ই একসময়।

সাকিব-তামিমের মধ্যে সেটিকেই ব্যক্তিজীবনেও খুব ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে’ রূপ দিতে বাকি কাজটা করল ভক্ত-দর্শকদের কল্পনা। মানুষ সাফল্য দেখতে, সাফল্যের গল্প শুনতে ভালোবাসে। মূল চরিত্ররা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেই না সেই গল্পটা জমে! অথচ কাছের মানুষেরা জানেন, তাদের দুজনের কেউ কারো শীর্ষ ১০ বন্ধুর তালিকায় ঢুকতে হলেও জোর লবিং ছাড়া উপায় নেই।

সাকিব-তামিমের মধ্যে ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব’ আবিষ্কার করা কিংবা দুজনের সম্পর্কে ‘তুষের আগুনে’র উত্তাপ অনুভব করা—দুটোই আসলে কল্পনার বাড়াবাড়ি। বাস্তবে সাকিব-তামিম আগে যেখানে ছিলেন, এখনো সেখানেই আছেন এবং সেটা কাল যেখানে ছিলেন সেখানে। বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমের সামনে সবুজ গালিচার আড্ডায়। একে অন্যের খুব ভালো সতীর্থ হয়ে বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড় তালিকায়। সেখানে বন্ধুত্ব বা পারস্পরিক পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারটা অন্তত তাঁদের কাছে অত গুরুত্বপূর্ণ নয়। মাঠের বোঝাপড়া ঠিক রেখে দলের জন্য ভালো খেলাটাই সব। দুজনেই ক্রিকেটটা খুব ভালো বোঝেন, সেখানেই তাদের ‘বন্ধুত্ব’।। মাঠে তাই একজন আরেকজনের খুব ভালো ‘পার্টনার’ এবং তাতে উপকৃত হয় দল ‘বন্ধুত্ব’ সেখানেই। মাঠের খেলায় সাকিব-তামিমের বোঝাপড়ার রসায়নে তেজস্ক্রিয়তার বুদ্‌বুদ দেখেছেন, এমন দাবি কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউই করেননি।

একসময়ে সাকিবের সহ-অধিনায়ক তামিম এখন নিজেই ওয়ানডে দলের অধিনায়ক। তাঁর কোনো সহ-অধিনায়ক আপাতত নেই, কিন্তু মাঠে দরকার পড়লে যে সবার আগে নেতৃত্বে অভিজ্ঞ সাকিবকে ডেকেই পরামর্শ চাইবেন, সেটি তামিমের নেতৃত্বে ২০ জানুয়ারির প্রথম ওয়ানডের আগেই বলে দেওয়া যায়। তামিম বাংলাদেশ দলের ওয়ানডে অধিনায়ক, কিন্তু সাকিব তো ওয়ানডের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার! তাঁর মতো একজন দলে থাকলে অধিনায়কের রাতের ঘুম এমনিতেই ভালো হয়। সাকিব যখন অধিনায়ক ছিলেন, তামিমের কাছ থেকে দুটো সাহায্য তিনি পেতেন। একটা তো মাঠের পারফরম্যান্স। আরেকটা হলো মাঠের বাইরে দলটাকে বিনি সুতার মালায় গেঁথে রাখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.