গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হচ্ছে : বাইডেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের ১০০ দিনের ১ দিন আগে কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে দেওয়ায় বক্তৃতায় বাইডেন এসব কথা বলেন,” আমেরিকার গণতন্ত্রের ওপর ইতিহাসের নজিরবিহীন হামলা হয়েছে। গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে হবে। আমেরিকা আবার সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। সংকট কাটিয়ে আমেরিকা আবার স্বপ্ন দেখছে। আবার কাজে নেমে পড়েছে। বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমেরিকা উঠে দাঁড়িয়েছে।”

প্রথা অনুযায়ী যৌথ অধিবেশনে প্রেসিডেন্টের দেওয়া এমন বক্তৃতার সময় সরকারের সব বিভাগের ঊর্ধ্বতন লোকজনসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিতি থাকেন। কিন্তু চলমান স্বাস্থ্যসতর্কতার জন্য এবারের অধিবেশনে নির্দিষ্টসংখ্যক লোক উপস্থিত ছিলেন।প্রেসিডেন্ট বাইডেনের উদ্দীপনাময় বক্তৃতার সময় ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতারা দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর ও প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সমালোচক টেড ক্রুজকে এ সময় চোখ বন্ধ করে ঝিমাতে দেখা যায়।

নজিরবিহীন নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে গত জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। করোনা মহামারিসহ আমেরিকার সমাজ-রাজনীতির এক অস্থির সময়ে বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেও উত্তরসূরি বাইডেনকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকার করেননি। ইতিহাসের চরম বিভক্তির সময় ক্ষমতা গ্রহণ করে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বিভেদের বদলে ঐক্যের আমেরিকার কথা বলেন।

আমেরিকার ইতিহাসে বাইডেনই প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি দুজন নারী নেত্রীকে পেছনে রেখে জাতির সামনে কংগ্রেসে বক্তৃতা করলেন। কংগ্রেসে যৌথ অধিবেশনে পদাধিকার বলে সভাপতিত্ব করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। আর প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসে বক্তৃতার জন্য আমন্ত্রণ জানান। এবার স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানান।

প্রথা অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট তাঁর ডানে-বাঁয়ে আগে থেকে বাছাই করা কিছু আইনপ্রণেতাকে সঙ্গে নিয়ে কংগ্রেসের অধিবেশনে ঢোকেন। আইনপ্রণেতারা দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্টকে সম্মান জানান। বিচারপতিদের মধ্যে শুধু প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল লয়েড অস্টিন কংগ্রেসের অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। স্বাস্থ্যসতর্কতার জন্য আইনপ্রণেতাদের কোনো অতিথি নিয়ে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

বাইডেন তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ‘কংগ্রেসের এমন সভায় দাঁড়িয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন, শান্তি উদ্‌যাপন করেছেন। আজকে আমি আমেরিকার সংকট ও সম্ভাবনার কথা বলতে এখানে দাঁড়িয়েছি।’

প্রেসিডেন্ট বাইডেন তাঁর বক্তৃতায় আমেরিকার পরিবারগুলোর উন্নয়নে তাঁর আশু পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, দেশজুড়ে কমিউনিটি কলেজে বিনা মূল্যে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারবেন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ফেডারেল অনুদানের পরিমাণ বাড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে কর্মসংস্থানে যুক্ত করার কর্মসূচির জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হবে বলে জানান তিনি। কর্মজীবীদের জন্য ১২ সপ্তাহের সবেতন পারিবারিক ছুটি ও অসুস্থতার ছুটির ঘোষণা দেন বাইডেন।

প্রি–স্কুলের জন্য ও শিশুদের গ্রীষ্মকালের জন্য বিনা মূল্যে খাবার দেওয়ার কর্মসূচি বাড়ানো হবে বলে প্রেসিডেন্ট বাইডেন জানিয়েছেন। শিশুদের জন্য পরিবারকে ট্যাক্স ক্রেডিট দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাইডেন করপোরেট ট্যাক্স বৃদ্ধি করে, উচ্চ আয়ের লোকজনের ওপর ট্যাক্স বৃদ্ধি করে অর্থ সংস্থানের মাধ্যমে কল্যাণকর কাজে ব্যয় করবেন বলে তাঁর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। মধ্যবিত্তের ওপর কোনো কর বাড়ানো হবে না বলে তিনি জানান।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সতর্ক করে বাইডেন বলেছেন, “আমেরিকার ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপের পরিণতি তাঁকে ভোগ করতে হবে। ইরান ও উত্তর কোরিয়াকেও সতর্ক করেছেন তিনি। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের কথা আবার ব্যাখ্যা করেছেন বাইডেন।“

শ্বেতাঙ্গ রক্ষণশীলতাও জঙ্গিবাদের মতো বলে উল্লেখ করেন বাইডেন। তিনি বলেন, মার্কিন সমাজে বৈষম্যের অবসানে কাজ করতে হবে। পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক ও বিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য কাজ করতে হবে। কংগ্রেসকে দলীয় মতপার্থক্য ভুলে এ নিয়ে আইন প্রণয়নের জন্য তিনি আহ্বান জানান।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন করোনা মহামারি মোকাবিলায় তাঁর প্রশাসনের প্রয়াসের কথা উল্লেখ করেন। দেশের ৫ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে তিনি আমেরিকাকে আবার আশার বাণী শোনান। অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য ফিরে আসছে, কর্মসংস্থান বাড়ছে উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, আমেরিকা আবার জেগে উঠছে। বিপদ ও সংকটকে সম্ভাবনায় পরিণত করা, দুর্বলতাকে শক্তিতে পরিণত করার কথা বলেছেন বাইডেন।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন তাঁর অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ পরিকল্পনার ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। সৃষ্ট কর্মসংস্থানের ৯০ শতাংশই আমেরিকার কর্মজীবীদের হবে। এ ধরনের ৭৫ শতাংশ কাজের জন্য কোনো কলেজ ডিগ্রির প্রয়োজন হবে না।

অভিবাসন সংস্কার নিয়ে বাইডেন বলেন, তিন দশক ধরে শুধু কথাই বলা হচ্ছে। কিন্তু অভিবাসন নিয়ে কিছুই করা হয়নি। যেসব দেশ থেকে নথিপত্রহীন অভিবাসীদের আগমন ঘটছে, সেসব দেশকে সাহায্য করে আমেরিকা অভিমুখী যাত্রা বন্ধ করতে হবে বলে তিনি বলেন।

অভিবাসীরা আমেরিকার ইতিহাসে, এমনকি করোনা মহামারির সময়ে বিশাল অবদান রেখেছেন বলে বাইডেন উল্লেখ করেন। আমেরিকা অভিবাসনকে সমর্থন করে জানিয়ে বাইডেন এ ব্যাপারে কংগ্রেসকে দ্রুত সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান। অল্প বয়সে আমেরিকায় আসা নথিপত্রহীন লোকজনসহ বাইরে থেকে আসা কর্মজীবী ও অভিবাসী কৃষিশ্রমিকদের অনুকূলে অভিবাসন আইন প্রণয়নের জন্য তিনি আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।

আমেরিকার ৫৬ বছরের ঊর্ধ্বের লোকজনের মধ্যে ৭০ শতাংশকে পূর্ণ টিকার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে বলে জানান বাইডেন। ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিনের মধ্যে ২২ কোটির বেশি ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বাইডেন বলেন, ১৬ বছরের বেশি সব আমেরিকানের নাগালের মধ্যে এখন টিকাকেন্দ্র রয়েছে। তিনি ১৬ বছরের বেশি বয়সীদের টিকা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিনের মধ্যে ১৩ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন বলে উল্লেখ করেন বাইডেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পর আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে বলে তিনি জানান। কর্মজীবীদের ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১৫ ডলার করা হবে বলেও তিনি ঘোষণা দেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *